দেশভাগ আমার জীবনের জন্য একটা ক্ষতস্বরূপ || হাসান আজিজুল হক

রাহেল রাজিব : স্যার আপনার শৈশব সম্পর্কে কিছু বলুন।

হাসান আজিজুল হক : আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। এই বিষয়টিকে আমি অন্যভাবে দেখি। আমার লেখায় নানাভাবে বিষয়টি এসছে। এটাকে নস্টালজিয়া না বলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিয়েছি। ভারতবর্ষের রাজনীতি একটু হলেও বুঝবার চেষ্টা করেছি। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানরা কীভাবে অংশগ্রহণ করল, স্বাধীনতা লাভের আগেই বহু লোক কেন ছুটে গেল দেশটাকে বিভক্ত করার জন্য। যারা মুক্ত হতে চাইল আবার তারাই নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ তুলে বিভক্ত হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হলো কেন।

এটা কি রাজনৈতিক অপরিপক্বতার পরিচয় নয়? এই প্রশ্নের আগের প্রশ্ন হলো এই স্বাধীনতাবিরোধী আন্দোলন কারা করেছিল, কাদের জন্য করেছিল এবং তাতে জাতিগত অবদান হিসেবে মুসলমানের অবস্থান কী ছিল। সেই আন্দোলনে মুসলমানরা কি গিয়েছিল? মুসলমানরা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকেই নিজেদের একটু দূরত্বে রাখার চেষ্টা করছিল এবং ভারতবর্ষ স্বাধীনতার জন্য এগিয়ে এসেছে কে? একজন ব্রিটিশ! এটা কিন্তু বিস্ময়। আমাদের ভেতরে আমাদের অধিকারকে সচেতন করতেও তাদের দারস্থ হতে হয়েছিল। এই আন্দোলনটা তো একদিনে হয়নি। শুরুটা অনেক আগে হলেও জোরদার আন্দোলন শুরু হয় উনিশ শতকের শেষে এবং পরবর্তী চার দশক অর্থাৎ ভাগ হওয়া পর্যন্ত মুসলমানরা সেখানে গিয়েছে কি? আবেগ থেকে কথাগুলো বললাম না_ বলো গিয়েছে কি? সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে কি?

 

 

 

রাহেল রাজিব : সেভাবে দেখা যায় না। তবে গান্ধী ও জিন্নাহ দুজনার নেতৃত্ব তো অনস্বীকার্য।

হাসান আজিজুল হক : (গলার স্বর কিছুটা উচ্চগ্রামে তুলে বলেন) জিন্নাহ কি ভারতীয়? স্বাধীনতা সংগ্রামে সে কোত্থেকে এলো? ভারতবর্ষের অখণ্ডতাকে রক্ষা না করে এটাকে মুক্ত করা যেত না? এটি তো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, তাই না? আমি এটাকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনই বলি। উপনিবেশ থেকে মুক্ত করার এ আন্দোলনে সবাই শরিক হতে পারে। এখানে তো আর বামপন্থী-ডানপন্থী বলে কোন ব্যাপার ছিল না। তাহলে এ আন্দোলনের বিশের দশক থেকে মুসলমান সমপ্রদায় অংশগ্রহণ করেছে কিভাবে এবং কতটুকু? সব সময়ই একটা দূরত্ব রেখে চলেছে। কেন দূরত্ব রেখেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। আমার তো মনে হয় আমরা সাধারণভাবে বহু জিনিস করছি না। যেগুলো করি সেগুলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবেগ থেকে করি। সাহিত্যে নস্টালজিয়া কিংবা আপনি কত কষ্ট করেছেন ইত্যাদি বিষয় এসেই যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা তো ঠিক তা নয়। এটি গভীরভাবে অনুধাবনের বিষয়। দেশভাগ আমার জীবনের জন্য একটা ক্ষতস্বরূপ। ক্ষত সারলেও দাগ থেকে যায়। আমি এই দাগের কারণ অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি।

 

 

 

রাহেল রাজিব : স্যার আমার ঠাকুরদার জন্ম আসামে। সে হিসেবে আমাদের ওরিজিন আসামে। দেশভাগ হয়েছে; কিন্তু সম্পর্ক তো ভাগ হয়নি। এখন এই সম্পর্ক কাঁটাতারের বেড়ায় প্রায় বিচ্ছিন্ন। জীবনের এসব জটিলতা, কষ্ট, পীড়ন যা দেশভাগের ফলে আপনার হৃদয়ে ক্ষরণ ঘটিয়েছে সেই পীড়নগুলোর সংজ্ঞারূপ আপনার অনেক লেখা। এবিষয়ে আপনার অভিমত কি?

হাসান আজিজুল হক : সমুদ্রের স্বপ্ন ও শীতের অরণ্য, আত্মজা ও একটি করবী গাছ থেকে শুরু করে সমপ্রতি প্রকাশিত আগুন পাখি পর্যন্ত প্রায় সব লেখাতেই এই বিষয়টি এসেছে। শিল্পীর তুলিতে বেদনার নীল রঙ যতই গাঢ় হোক না কেন একান্ত কিছু আবেগের রঙ তো ক্যানভাসে নয়। এটা একেবারেই ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ। এই ব্যক্তিকষ্টটাই জানতে চাই। তিনি আবারো শুরু করেন, আবার ওই কথাই আসবে। তোমাদের ফরিদপুরের বাড়িটা বেদখল। তোমার কি মনে পাল্টা প্রশ্ন হয়নি পশ্চিমবঙ্গের কতজন মুসলমানের বাড়ি বেদখল হয়েছে?

 

 

 

 

রাহেল রাজিব : আমি যতবার গিয়েছি সেরকম কিছু দেখিনি। তবে বর্ডার এলাকার অবস্থা ভিন্ন। নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা দুজায়গাতেই নিপীড়িত-অবহেলিত। এখানে আবার নিম্নবিত্ত মুসলমানের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে।

হাসান আজিজুল হক : আমি কিন্তু সমপ্রদায় বিশেষে উদারতার হেরফের প্রসঙ্গ তুলিনি। আমি কিন্তু একবারও বলিনি মুসলমান সমপ্রদায়ের উদারতা কতটুকু বা হিন্দু সম্পদায়ের উদারতা মুসলমানদের চেয়ে অনেক উদার সাম্প্রদায়িক ব্যাপারে। আমি পুরো বিষয়টাকে হিস্টোরিক্যাল এবং সোশ্যাল ইভেন্ট হিসেবে দেখতে বলেছি। আর ব্যক্তিগত কষ্টের জায়গাটাকে আমি আলাদা রাখতে বলেছি। আমি লেখক হিসেবে ব্যক্তিগত কষ্টটাকে আলাদা রেখেছি। তোমাকেও রাখতে হবে। তুমি যে সমস্যাগুলোর কথা বললে সে প্রসঙ্গে বলতে চাই, আমাদের ভারতবর্ষ ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে।

 

 

ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ নামে তিনটি রাষ্ট্র হয়েছে। আমাদের সঙ্গে ভারতের কাঁটাতারের বেড়ায় সম্পর্ক আলাদা হয়ে গেছে। কারণটা কি? আমাদের এই অঞ্চলটা অনুন্নত, যেখানে রিচ্যুয়াল থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুতেই একটা বিশৃঙ্খলা এবং পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে যুদ্ধমান একটা অবস্থা, ফলে আমাদের এখানে রাষ্ট্রগুলোর গড়ন ঠিকমতো হয়নি। রাষ্ট্রগুলো গণতান্ত্রিকও হয়নি। ফলে এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ এত বেশি। ইউরোপে সেরকম নয়। বিষয়টি পুরোপুরিই একটি রাজনৈতিক সমঝোতা, যা আমাদের উপমহাদেশে কখনই সম্ভব হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ।

 

 

 

 

রাহেল রাজিব : আপনি তো অখণ্ড ভারতবর্ষ দেখতেই অভ্যস্ত। খণ্ডিত রাষ্ট্রের পীড়ন কীভাবে আপনার লেখায় উঠে এসেছে?

হাসান আজিজুল হক : আমাদের আক্ষেপের কমতি নেই। তথাকথিত ভাগ করেও সাতচলি্লশের পরে মুসলমানরা ভালো থাকতে পারেনি। এখনো ভালো নেই। আমাদের এখানে ভাগ হওয়ার ফলে এখানেও উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হলো। ভাষা আন্দোলন হলো, মুক্তিযুদ্ধ হলো। সব ভালো ভালো কথা। খারাপ তো একটাও নয়। সবই ভালো। কিন্তু বিশাল ইতিহাসের পটটাকে সামনে রেখে সবই করা হয়। আমার আপত্তি এ জায়গায়। বিশাল ইতিহাসের পটটাকে সামনে রেখে যদি বিষয়গুলো কর তাহলে জিনিসটা দাঁড়ায়। আমাদের দেশের সেলিব্রেটিরা কিছু না জেনেই আস্ফালন করে বেড়ায়। আমাদের লেখকরা সেই অর্থে বড় হবে কি করে? বড় হওয়ার তো একটা ব্যাপার আছে। আমরা বড়জোর গল্প লিখি, উপন্যাস লিখি। ব্যস এতটুকুনই। কিন্তু পামুক যখন লেখে সমগ্র ইউরোপটাই চলে আসে। ইতিহাসের বিশাল বিশাল উত্থান-পতন ওই তুরস্ক থেকেই। এবং ওই জায়গাটা দখল করতে পারলে হিটলার বলেছিল আর আমাকে কিছু করতে হবে না। ওই জায়গাটা দখল করতে পারলে গোটা পৃথিবী বশে আনা যাবে। আমাদের লেখকরা বড় হব কি করে? বড় হওয়ার চেষ্টা নেই, তাই উপায়ও নেই। হাতির বাচ্চা যত ছোটই হোক তা কুকুরের বাচ্চার চেয়ে বড় হবে। আমাদের তো কোনো দোষ নেই, আমরা তো এতটুকুন বাচ্চা।

 

 

 

 

রাহেল রাজিব : এক্ষেত্রে কি আমাদের প্রধান সমস্যা নেতৃত্ব?

হাসান আজিজুল হক : আমাদের জাতির কোনো শিক্ষক নেই। আমাদের ইন্টেলেকচুয়ালরা প্রকৃত ইন্টেলেকচুয়াল নয়। যদি বিশাল জায়গা থেকে ভাবা যায় তবে আমাদের মাপই ছোট। এই মাপটা বড় করতে হবে। আপাতত এইটুকু খেয়াল করলে হবে যে_ আমাদের মাপ ছোট এই বিষয়টিকে আমরা জানি। নিজেকে ছোট ভাবলেই তবে বড় হতে পারবে। আমাদের মাপটা ঐতিহাসিকভাবে ছোট হয়ে গেছে আর কি। ঠেলতে ঠেলতে একেবারে কিনারে এনে ফেলে দিয়েছে। সীমাবব্ধতার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখলে সেখানেই গ-িবদ্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

About আবেদিন খান

Check Also

ফ্রিলান্সারের প্লান B রেডি আছে তো?

আপনি যদি ফ্রিলান্সার হন, মাসে যদি মোটামুটি নিদিষ্ট একটা ইনকাম করছেন, তবে বোঝা যায় আপনার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *