গদ্য : আমি বাঁচতে ভীষণ ভালবাসি

দু’হাত ভাঁজ করে মাথার নিচে বালিশ দেই তখন আকাশের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরী হয় । এই সম্পর্ক মধ্য রাতের আকাশ যখন হাত মুখ ধুয়ে প্রহরীর রূপ নেয় ঠিক তার সাথেই আমি ও আকাশ মুখোমুখি । আমাদের  এই যে সম্পর্ক তৈরী  হয় তাতে চোখের পেছনে খুলির ভেতর যে মগজ তার সেল জুড়ে কিছু চিন্তা খেলা করে_আমি ছোট থেকেই ভীষণ দুরন্ত সকল ছেলেখেলা আমার প্রিয়’র তালিকায় । চিন্তার ভেতর হেঁটে হেঁটে শঙ্কের কোন বাঁক থমকে যাই_অবাক হই নিঃশ্বাস জব্দ করে_ভুলে যাই পলকটাকে চোখের মণিতে মাঝে মাঝে লিপে দিতে হয় । আমি অবিশ্বাস্য রকম আমার মতো বাঁচতে ভালবাসি । তাই আমার কাছে ভালবাসার রঙ বৃষ্টির ধুয়ে যাওয়া মাটি’র মতো ।

আর যখন বুঝতে শিখেছে স্বর বর্ণের আত্মীয়তা সকল শব্দে ঠিক তখনই বাক্যের মতো সবুজ পড়ে যেতাম । বৈরাগী মাঠের চোখ রাঙ্গানীতে সকাল থেকে সন্ধ্যা হতো আর জোনাকের মুঠো বন্দী খেলায় নক্ষত্র নেমে যেতো আমার দাওয়ায় । অবাক হতাম_দু’কান চেপে ধরে নৈঃশব্দের শব্দ মতো আমার হাতে মেঘ থেকে গলে যে জল পড়তো তার সচ্ছ শব্দ শুনে মাতাল হতাম । আমি মাতাল হতে ভালবাসি ।

শিশুপাঠের বইগুলো ধুলোয় জড়িয়ে পরলে পাড়ি জমাতে হলো পিচঢালা পথ ধরে এক দেয়াল বন্ধ নগরে । যে নগরে আধারকে লুকিয়ে সবর্ত্র আলো জ্বলিয়ে রাখে নগরপিতা যদিও তিনি কোন সন্তান প্রসব করেনি । বাবাকে দেখেছি জীবনকে বয়ে নিয়ে যেতো আর আমাকে প্রস্তুত করতো পরবর্তী হালের জন্য । এবারও অবাক হলাম, নগরের কোন ঘ্রাণ নেই তবে এক টাকায় ঝাল দুটো চকলেট পাওয়া যেত । চাইলেই আকাশ ছোঁয়া যেতো ছাদের পিঠে চড়ে কিংবা মাথার উপর ঝর্ণা নামিয়ে আনা যেত সরু নলের ভেতর করে । শহরের পথ ধরে রেললাইন চলে যেতো কোন জনপদে আর রাতের বেলা সোডিয়াম আলোতে নিজের গায়ের রঙ পাল্টে গিয়ে কোন এক পড়শী মনে হতো নিজেকে । শহরে এসে আলো খেতে শিখেছি_নিরেট সোডিয়াম আলো আর তার পেট ছিঁড়ে বের হলে আমার যে গায়ের রঙ হতো_আমি তাকে খুব ভালবাসি ।

আমার শহর ছিল সমুদ্র কাছাকাছি একদম ঠোঁটের নিচে উত্তাল কোন চিবুকের মতো । সমুদ্র আর নদীতে মাখামাখি ছিল শহরের পেট ও হাত । নদী যেখানে নিজকে বিসর্জন দিতো সমুদ্রে ঠিক সেখানটায় দাঁড়িয়ে বিলিয়ে দেওয়ার সুর ঢেউ এর মাতমে জানিয়ে দিত সমস্ত তীর_আমি তার প্রেমে পড়ে আছি বহুকাল ধরে এবং প্রেমটাকে রেখেছি অপরিণত । কারণ মাঝে মাঝে আমি হারাতে ভালবাসি । আমি এক সমুদ্র পাগল ছেলে যার বিশালতায় নেশা ধরে যায় চোখ থেকে সমস্ত শরীর । প্রকৃতির সকল অঞ্চলের রেখাগুলো গড়িয়ে আমার হাতের রেখা হয়েছে জন্ম থেকে । আমি মানচিত্র নিয়ে বাঁচি তাই জল ও সবুজ আমাকে ধারণ করে_অতঃপর ভালবাসে ।

কোষের সাথে সাথে যখন আঙ্গুলগুলো বড় হলো আর সাদা দেয়ালের শিরায় শিলায় জমলো শ্যাওলা, নগরের বর্ষা আর শীতের ভেতর বসন্ত কোন দ্বন্ধ রেখে যাচ্ছিল না তাতেই অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম । আমার ভালবাসার যে ক্ষয়ে যাওয়া রূপ চোখের সামনে দাগ রেখে যাচ্ছিল_নাম তার হৃদয় ক্ষরণ । ভালবাসার সকল রঙ লুট হয়ে যাচ্ছে দিব্যি উন্নয়নের দোহাই দিয়ে আর ঠায় দাঁড়িয়ে পায়ের আঙ্গুলে মাটি খুঁটে খুঁটে মাটি সাথে সম্পর্ক রেখে যাচ্ছিলাম । নিজেকে প্রতিবন্ধী মনে হচ্ছিল কারণ ভালবাসার বিলোপে এক মহাশূণ্য সমান শূন্যতায় ভাসছিলাম । আমার ভালবাসার ভীষণ প্রয়োজন ছিল ।

আমি যখন শূন্যতায় বন্ধনহীন ভাসছি ঠিক তখনই মধ্যাকর্ষণের মতো তুমি টেনে নিলে প্রিয়তমা । প্রকৃতির সকল রূপ তুমি ধারণ করলে । যে জলে পা ডুবিয়ে জলের নৃত্য জেনে নিতাম তা তুমি দেখিয়েছো তোমার চোখের ভেতর এক মায়াময় গভীরতায় । যে গভীরতাকে অতল ভাবি আজও ফলে আমি ডুবতে ভালবাসি তাই সাঁতার আমার ভীষণ অপ্রিয় । যে হাওয়ায় সবুজের শীষ সামরিক কায়দায় কোন ঢেউ তুলে দিতো জমিনের বুক_আমি তার ভেতর সংঘর্ষে জড়িয়ে যেতাম অবলীলায় আর এখন তোমার ছায়াবাদী চুলের ভেতর থেকে আমাকে সংঘর্ষের যে ডাক দিয়ে যায় তা অগ্রাহ্য করতেই পারি না । কি অদ্ভুত! বাধ্যগত সৈনিকের মতো তোমার চুলের ঢেউ খেলানো হাওয়ায় সংঘর্ষে জড়িয়ে যাই । ছেলেবেলায় সেই দূর্গার উত্তাল থুতনিতে আমার ভাঙ্গন হতো পুরো পূঁজা জুড়ে । ঢোলের শব্দ যতটা না কানে যেত তারচেয়ে দূর্গাদেবীর থুতনির চাহনিতে আমি স্পর্শকাতর হয়ে যেতাম । মাটিতে গড়া মূর্তি থেকে জলজ্যান্ত তোমার থুতনিতে আমার স্পর্শকাতর ছেলেবেলা খুঁজে পাই । আমি অবাক হই জেনে, তোমার থুতনিতে  তাকিয়ে আমার শরীর থেকে উৎপাদিত হবে শহরের সমস্ত বিদুৎ । যে মাটিতে শুয়ে মাটির ঘ্রাণে মন ও শরীরের সকল ভার দিয়ে দিতাম মাটিতে_ঠিক তেমনি তোমার ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে আমার নেশা হয়ে যায় । নেশাতুর চোখ নিয়ে নিজেকে ভাবি আর এক উপলদ্ধিতে জানিয়ে দিই; প্রিয়তমা তোমাকে আমি প্রচণ্ড ভালবাসি কেননা এই মহাবিশ্বে ভালবাসাতেই আমি বাঁচি আর আমি বাঁচতে ভীষণ ভালবাসি ।

[ শৈলী ভালবাসা সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ ও  প্রকাশিতব্য আমার আত্মজীবনী  “এপিটাফ”  এর অংশ বিশেষ ]

About B@ngl@desh1

Check Also

ফ্রিলান্সিং- মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুনদের স্বপ্নভঙ্গের নতুন ভাইরাস।

ফ্রিলান্সিং- মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুনদের স্বপ্নভঙ্গের নতুন ভাইরাস। দায়ী কে? . পুরো লেখাটি না পড়ে, আপনি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *