বিগত ৩০ জুলাই সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও দখিনা কর্তৃক আয়োজিত ‘শব্দ দূষণে যাপিত জীবন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের প্রেক্ষিতে আমার অত্র নিবন্ধের সূত্রপাত । উল্লেখিত গোলটেবিল বৈঠকে অধ্যাপক এম আলী আশরাফ কর্তৃক ‘Noise Pollution : Scenario Chittagong’ শিরোনামে উপস্থাপনায় চট্টগ্রামে বিদ্যমান শব্দ দূষণ, দূষণের ফলে মানবদেহের ক্ষতি সম্পর্কে সাম্যক ধারণা উপস্থাপন করা হয় । উল্লেখিত উপস্থাপনা এবং সুনির্দিষ্টভাবে শব্দ ও দূষণ সম্পর্কিত আমার ভাবনা অত্র নিবন্ধে ব্যক্ত করব ।
বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল এর কথা দিয়ে ভাবনার বয়ান শুরু করছি । ২০০০ সালের পূর্বে চট্টগ্রাম নগরের গাছে বা বাড়ির কার্ণিশে জোড়ায় জোড়ায় কিংবা নিঃসঙ্গ দোয়েলের বিচরণ নয়ত ডাকাডাকি ছিল সাধারণ ঘটনা । নগরের নির্জন পথে, ঘাটে, মাঠে, রাতের অন্ধকারে জোনাকী বিচরণ ছিল তাঁরা ঝলমলে দৃশ্যপট । এছাড়া নাগরিক আবাসে মাকড়সা বা গান্ধীপোকা অথবা রঙ-বেরঙের পতঙ্গ ঢুকে আতংক সৃষ্টি করা ছিল স্বাভাবিক ঘরোয়া উত্তেজনার বিষয় । আর কর্ণফুলী নদীতে ফেরীর সঙ্গে সঙ্গে তখন দেখা যেত শুশুক ও ডলফিন । এবং নগরের আকাশে প্রহরীর মত উড়ে বেড়াত চিল ।
২০০০ সালের পূর্বে । তখন চট্টগ্রাম নগরে মানুষ ও প্রকৃতি মিলে মিশে নিভৃত, নির্জন সৌন্দর্য নিয়ে ছিল ষড়ঋতু । ঋতুর উপস্থিতি নির্দেশের জন্য ছিল সমস্ত রকম প্রাকৃতিক উপকরণ । নগরের উর্বর ভূমিতে ফল, ফুল ও আবাদের সঙ্গে মানুষ ও নগরায়নের যেমন ভারসাম্য ছিল । তেমনি আরও ছিল প্রাকৃতিক সুমধুর, শ্রুতিময় শব্দের ভরপুর উপস্থিতি । নাগরিকের তখন ছিল ক্ষুধা নিবারণের জন্য বিশুদ্ধ খাবার, দেখাবার জন্য প্রাকৃতিক ও উজ্জ্বল দৃশ্যপট, শোনার জন্য প্রকৃতিতে বিদ্যমান মোহনীয় শব্দ, ঘ্রাণের জন্য মাতাল প্রাকৃতিক সুঘ্রাণ আর বিকশিত হওয়ার জন্য উজ্জ্বল, সুস্থ আবহাওয়া ।
ঐসব ২০০০ সালের পূর্বে চট্টগ্রামের অবস্থা ও পরিস্থিতি । এরপর ধীরে ধীরে নগর জমজমাট হয়ে উঠল । মানুষ বড়ল । সঙ্গে বসতি বাড়ল । বাড়ল যানবাহন । বৈদ্যুতিক আলোর উজ্জ্বল উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে ঢেকে গেল নগরের আকাশ । থেমে গেল নগরের বিশুদ্ধ বাতাস । কেড়ে নিল নগরের সহনীয় শব্দের(sound) জগৎ । রাস্তা-ঘাট, ফুটপাত-পার্ক, বিনোদনকেন্দ্র কিংবা চৌরাস্তা, ঘর-বারান্দা সর্বত্র কোলাহল আর কোলাহল । শব্দ(sound) ভীড়ের মধ্যে শুরু হল নাগরিক যাপন ।
শব্দের(sound) সহনীয় মাত্রার আধিক্য । শব্দ(sound) দূষণ । যা কেবল মানুষের শারীরিক ক্ষতিই নয় । বরং তার চেয়ে ভয়াবহ ভাবে মানুষের চারপাশ তথা বেঁচে থাকবার পরিবেশ কেড়ে নিয়েছে । চট্টগ্রাম নগরে যখন ধীরে ধীরে শব্দের(sound) মাত্রা বাড়তে লাগল । এই উচ্চ মাত্রার শব্দের(sound) দরুন পোকা-পতঙ্গের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বিরাট বাঁধা হয়ে দাঁড়াল । পোকা-পতঙ্গ তাদের যোগাযোগ ও খাবারের জন্য যে তরঙ্গের ওপর নির্ভর করত । সেখানে মানুষ সৃষ্ট অত্যধিক শব্দ তরঙ্গের জন্য তাদের মধ্যে সংকট তৈরী হল । এই সংকটে পোকা-পতঙ্গ শব্দবহুল এলাকা পরিত্যাগ করে দূর সরে গেল । পোকা-পতঙ্গের এই দূর সরে যাওয়ায় প্রথম ক্ষতিগ্রস্থ হল গাছ । পোকা-পতঙ্গ যখন অত্যধিক শব্দের(sound) দরুন অত্র চলে গেল । এর সঙ্গে সঙ্গে গাছের পরাগায়ণ ও বীজের সম্ভবনাও কমে গেল । ফলে । ধীরে ধীরে নগরের ভূদৃশ্য(landscape) পরিবর্তন হতে শুরু করল । বহু গাছ নিরবে হারিয়ে গেল । প্রাকৃতিকভাবে গাছের বিকাশ ও বিস্তার বন্ধ হয়ে গেল । নগর হয়ে গেল গাছবন্ধ্যা । এবং মানব সৃষ্ট অত্যধিক শব্দ তরঙ্গের দরুন পোকা-পতঙ্গের অনুস্পস্থিতির কারনে। নগরের পোকা-পতঙ্গ খেকো পাখির বিচরণ হঠাৎ করে যেন থেমে গেল । সে সব পাখি খাদ্য সংকটে নগর ছেড়ে গেল । এছাড়া উচ্চ মাত্রার শব্দের(sound) দ্বারা পাখিদের যোগাযোগ ও প্রজননের ওপর প্রভাব পড়েছিল । যার ফলে নগরের দোয়েল, বুলবুলি, ফিঙ্গে- এর মত অসংখ্য পোকা-পতঙ্গ খেকো পাখি হয় নগরে ছেড়ে অন্যত্র চলে গেল নয়ত বিনাশ হয়ে গেল । নগরের স্থলে নয়, জলেও শব্দের অত্যধিক উপস্থিতির দরুন কর্ণফুলীর শুশুক, ডলফিন শব্দবহুল এলাকা ছেড়ে দূর সরে গেল । তেমনি শব্দ(sound) দূষণ কবলিত এলাকায় মাছের প্রকৃতিক উৎপাদন কমে গেল । তাই সহনীয় মাত্রার অধিক শব্দ(sound) কেবল মানুষ নয়, প্রকৃতির সকল প্রাণের জন্য ক্ষতি কারন হয়েছে । বাস্তুতন্ত্রের(ecosystem) সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানুষ থাকলেও, মানুষ তার বাস্তুতন্ত্র তথা পরিবেশের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র সমস্ত প্রাণ ও বস্তুর সঙ্গে জড়িত । কারন, পৃথিবী তথা মহাশূন্যের সমস্ত কিছু একে অন্যের সঙ্গে জড়িত । এই বিরাট, বিস্তৃত অসীম জগতে কোন কিছু বিচ্ছিন্ন ভাবার কোন অবকাশ নেই । তাই শব্দের(sound) সহনীয় মাত্রার অধিক উৎপাদন মানবদেহ, পরিবেশ, পৃথিবী তথা বিস্তৃত অসীম মহাশূন্যের জন্যও ক্ষতিকর । যে শব্দ(sound) মানুষ সৃষ্টি করছে । সেই শব্দের তরঙ্গ বিনাশ হচ্ছে না। বরং মহাশূন্যে এই তরঙ্গ রয়ে যাচ্ছে । কিছু স্থান দখল করছে । শব্দের(sound) স্থান দখলের ভাবনা অবশ্য আরও গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা তৈরী করে । ভবিষৎ সময়ে শব্দের(sound) অত্যধিক অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন মানুষের শুধুমাত্র দেহের জন্য ক্ষতির কারন হবে তা নয় । বরং আরও বৃহৎ কোন বিপর্যয়ের সমম্ভবনাকে পরিণতি হিসেবে প্রস্তুত করবে । এজন্য শব্দ’কে(sound) কেবল দূষণ হিসেবে চিন্তা করা হবে- শব্দ(sound) সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পোষণ না করা । যেমন; অপেরা শিল্পী উচ্চ কম্পাংকের শব্দে(sound) গ্লাস ভেঙ্গে ফেলতে পারেন। এভাবে উচ্চ কম্পাংক শুধু গ্লাস না ভূমিকম্পও সৃষ্টি করতে পারে । দেখা যায় ইতিমধ্যে নিকোলাস টেসলা একটি আর্থকোয়াক মেশিন আবিষ্কার করেন এই তরঙ্গের সাহায্যে। এছাড়া চিন্তা করুন,মায়ের ঘুমপাড়ানি গান শুনেই শিশুর ঘুম আসে। কেন? কারণ এতে যে সফট ফ্রিকোয়েন্সি থাকে তা শিশুর মনের জন্য প্রশান্তি দায়ক। আল্ট্রাস্নোগ্রাফির মাধ্যমে গর্ভের শিশুর ছবি তোলা হয় এটি কিন্তু শব্দের(sound) মাধ্যমেই। আবার শব্দ দিয়ে কিডনির পাথরও ধ্বংস করা হয় । এই শব্দ(sound) । যা পদার্থের কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয়। সেই শব্দের(sound) ক্ষমতা ভয়ংকর ।
দেখা যায় । শব্দ দূষণ কবলিত অঞ্চলে মানুষের ভাষার কিছু পরিবর্তন হয় । শব্দ দূষণের প্রতিক্রিয়ায় মানুষকে স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে উচ্চস্বরে কথাবার্তা ও শব্দ(word) উচ্চারণ করতে হয় । এতে করে মানুষের কণ্ঠস্বরের বিকাশ পরিলক্ষিত হয় । উচ্চস্বর উৎপাদনকারী কন্ঠস্বরের দরুন মানুষ কোমল শব্দের(word) ব্যবহার বাদ রেখে । বরং উচ্চ মাত্রার কম্পন সৃষ্টিকারী শব্দ(word) ব্যবহারে অভ্যস্ত হয় । এতে ভাষার জগতে এক ধরণের রূপান্তর ঘটে । উচ্চ কম্পাংক সৃষ্টিকারী শব্দ(word) ব্যবহারের ফলে মানুষের ভাবনার জগৎ, চিন্তা প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক পরিবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ।
মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় এর মধ্যে কান একটি । যে ইন্দ্রিয় মানুষকে শব্দের(sound) জগৎ সম্পর্কে ধারণা দেয় । পৃথিবীতে মানুষের জীবন যাপনে যখন তার শব্দ(sound) জগৎ সহনীয় মাত্রার অধিক হারে শব্দ(soud) গ্রহণ করে । অর্থাৎ মানুষের শব্দ(sound) জগৎ দূষিত হয়ে পড়ে । তখন মানুষের শব্দ(sound)গ্রহণের যে ইন্দ্রিয় ক্ষমতা তা ধীরে ধীরে লুপ্ত হয় । এতে করে মানুষের অন্যান্য ইন্দ্রিয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় । ঐসব ক্ষতিগ্রস্ত ইন্দ্রিয় এক সময় সব রকম ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে । অতঃপর মানুষ ইন্দ্রিয় ক্ষমতাহীন প্রাণবাহী কেবল প্রাণীতে পরিণত হয় । মানুষের যে বৈশিষ্ট্র্য তা তার অবশিষ্ট থাকে না । যা এক রকম বিবর্তন । এবং ভয়াবহ পরিণতির সম্ভবনা নির্দেশ করে ।
পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের মত শব্দও(sound) যে দূষিত হয় এই ভাবনা আমাদের সমাজে নতুন । শব্দের দূষণ নিয়ে গভীর ও কার্যকরী পর্যবেক্ষণ দেশে এখনও তেমন হয়নি । প্রকৃতি, সভ্যতা এবং মানব সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করে এখন পর্যন্ত আমার ভাবনা; শব্দ(sound) দূষণ মানুষ সহ প্রকৃতির সকল উপাদানকে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে । এই ক্ষতির ফলস্বরূপ প্রকৃতির চরিত্র পরিবর্তিত হচ্ছে । যেমন করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রকৃতির চরিত্র পরিবর্তন হচ্ছে । ভূমির দূষণ যেভাবে মানুষের শরীরে রোগ উৎপাদন করে মানুষকে বিনাশ করবার চেষ্টা করছে । তেমনি শব্দ(sound) দূষণ মানুষের শরীরে রোগ উৎপাদন সহ পরস্পর যোগাযোগের ভাষা ও চিন্তার জগৎ বিনাশে সক্রিয় হচ্ছে । এক্ষেত্রে দূষণ কেবল মানুষের দেহের ক্ষতি এই ক্ষুদ্র ভাবনা হতে সরে এসে । দূষণ দ্বারা পৃথিবী সহ সামগ্রিক মানবজীবন বিনাশের সম্ভবনার দৃষ্টিকোণ হতে পরিমাপ করা হবে বুদ্ধিমানের কাজ । কারণ; যে কোন সমস্যার সমাধানে প্রাণী জগতে একমাত্র মানুষের অনেক দূর এগিয়ে চিন্তার করবার ক্ষমতা আছে । তাই পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকবার লড়াইয়ে শব্দের(sound) জগৎ সম্পর্কে আরও গভীর ও নিভীড় ভাবনার অবকাশ রাখতে হবে । মানুষ যেভাবে চিন্তা বহন করে তেমনি প্রকৃতিকেও তার অস্তিত্বের মর্যাদা দিতে হবে । পৃথিবীতে মানুষের পৃথক হয়ে বেঁচে থাকবার কোন সম্ভবনা নেই । এটা এখন পর্যন্ত অনিবার্য সত্য ।
১ম প্রকাশ : দখিনা বাংলা মাসিক পত্রিকার ৪৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত
Tariqul Islam's Fun Page Keep life happy with worship