বাংলাদেশে কৃষির ইতিহাস উর্বর । অথচ ষাট দশক পরবর্তীতে খাদ্য ঘটতি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এ ভূমিতে আবাদ হয়েছে উচ্চ ফসলশীল বীজ । উচ্চ ফলনশীল বীজ চাষাবাদে রাসায়নিক সার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ভূমির ক্ষতি শুরু হয়েছিলো । তাতে সাময়িক ফসল উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ভূমি ও প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । ধীরে ধীরে উচ্চ ফসলশীল বীজের পর হাইব্রীড বীজের মাধ্যমে ভূমিতে ব্যবহার শুরু হয় কীটনাশক এবং সেচের জন্য ভূমির অন্দর হতে ব্যাপক পরিমাণে সেচজল । নব্বই দশকে হাইব্রীড বীজের চাষাবাদে ভূমির প্রাণ যেমন ধ্বংস হয়েছে তেমনি ধ্বংস হয়েছে জলজ প্রাণী তথা জীববৈচিত্র্য । সঙ্গে হাইব্রীড চাষাবাদে কৃষকের সেচ ও কীটনাশক ব্যবহারে আবাদ খরচ বেড়েছে । এবং যথার্থ বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষক বঞ্চিত হয়েছে ফসলের ন্যায্য দাম হতে । ফলশ্রুতিতে ইতিপূর্বে বাংলাদেশে লাভজনক পেশা কৃষি হতে মানুষ বিমুখ হলো ।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষি আর কৃষকের হাতে থাকছে না । চলে যাচ্ছে দেশীয় এবং বহুজাতিক কোম্পানির হাতে । কৃষি হয়ে যাচ্ছে এগ্রোবিজনেজ বা এগ্রোইন্ডাস্ট্রী । যেমন ইউরোপ আমেরিকায় কৃষকের সংখ্যা হাতে গোনা হলেও কৃষি উৎপাদন হচ্ছে । ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ১ কোটি ৪০ লক্ষ কৃষক আছে, আর যুক্তরাষ্ট্রে আছে মাত্র ২০ লাখ । যুক্তরাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যার মাত্র ২% কৃষক আছেন, অথচ ১০০ বছর আগে ছিল ৭০ থেকে ৮০% । বাংলাদেশে ৫০% জনগণ সরাসরি কৃষি কাজের সাথে যুক্ত, তার মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গা চাষী।
উচ্চ ফসলশীল বীজে ভূমিকে ক্ষতিগ্রস্থ করবার মধ্য দিয়ে প্রাণ ও প্রকৃতি হত্যার যাত্রা । হাইব্রীড বীজের আবাদে কীটনাশক ও ভূমির গভীরের জল ব্যবহার ভূমিকে চুড়ান্তরূপে খুন করা হলো । এবং ভূমি হতে প্রচুর পরিমাণে সেচের জল উত্তোলনে দূষিত করলো জল । যার ফলে উত্তরবঙ্গে জলে আর্সেনিকের উপস্থিতি হাইব্রীড বীজ আবাদের কর্মফল । এছাড়া কৃষকের আবাদকৃত স্থানীয় জাতের বীজ হাইব্রীড বীজ আবাদের আগ্রাসনে হারিয়ে গেলো । ফলস্বরূপ এদেশে ফসলের বৈচিত্র্য হারালো । কারখানার মত ক্রমাগত একই ফসল অল্প সময়ের উৎপাদন করতে লাগলো । ফসলের সঙ্গে ভূমি আর ভূমির সঙ্গে যে মানুষ জড়িত এই বিষয়খান ভুলে গেলো!
দেখা যায় যে; হাইব্রীড বীজের আবাদে কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসল মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর । যার লক্ষণ সমাজে মানুষের বিভিন্ন রোগ ও দূর্বল শরীর কাঠামোয় প্রকাশিত হচ্ছে । ভূমি হতে প্রাকৃতিক উপায়ে আবাদকৃত ফসলের পুষ্ঠিগুণ আর হাইব্রীড বীজের আবাদকৃত ফসলের পুষ্ঠিগুণের মাঝে ফারাক বিদ্যামান । প্রাকৃতিক বীজের আবাদ ভূমির প্রাণকে সজীব রাখে, লালন করে । হাইব্রীড বীজ আবাদে সহায়ক কীটনাশক ব্যবহারে ফলে ভূমির প্রাণ খুন হয়, বিষাক্ত হয় ভূমি । সেই বিষাক্ত ভূমির হাইব্রীড ফসল মানুষের জন্য নিশ্চিত বিষ ।
ঐসব হলো ক্ষতির বয়ান । আমাদের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ইতিহাস আরও করুণ । উচ্চ ফলনশীল বীজ আবাদের সূত্র ধরে, হাইব্রীড বীজের চাষাবাদ বিস্তার লাভে বাংলাদেশে কৃষকের কাছ হতে কৌশলে তার বীজতলা, বীজের মধ্য দিয়ে প্রাণ লালনের সংস্কৃতি কেড়ে নিয়ে পাচার করে দিলো কোম্পানী । ইতিপূর্বে এই উপমহাদেশে যেখানে তিন হাজারের অধিক জাতের ধানের বীজ ছিলো, সেখানে আজ অল্প কিছু জাত কৃষকের হাতে অবশিষ্ট আছে । কোম্পানীর কূটকৌশলে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দরুন ক্ষতি হলো ভূমির, ক্ষতি হলো ভূ-গর্ভস্ত জলের, ক্ষতি হলো প্রকৃতির, ক্ষতিগ্রস্থ হলো মানুষ । তাই কৃষির সঙ্গে জড়িত কৃষক হচ্ছে দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা অন্য কোন পেশাজীবী ।
হাইব্রিড বীজ ব্যবসায়ীর পাশাপাশি এখন কৃষি চলে যাচ্ছে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির হাতে, তথাকথিত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি জেনেটিকালী মডিফাইড অর্গানিজম বা জিএমও প্রবর্তনের মাধ্যমে। এখন বিশ্বে যেসব বড় বড় কোম্পানি কৃষির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী তারা এখন এমন বীজ প্রবর্তন করতে চায় যার মালিকানাসহ নিয়ন্ত্রণ কোম্পানির থাকবে। তারা বলছে ‘We, the corporations, own the seeds. You, the farmer, cannot save or replant them by law; you must buy new seeds every year from us, the corporations. [Ref: GMOs – who will feed us and what will they feed us? Nana Ama Amamoo 2013-09-26, Issue 647 http://pambazuka.org/en/category/features/89001] ’ আমরা, কর্পোরেশানরা, বীজের মালিক। তুমি, কৃষক, আইনগতভাবে বীজ রক্ষা বা পুণউৎর্পাদন করতে পারবে না; তোমাকে প্রতিবছর নতুন বীজ কিনতে হবে আমাদের (কর্পোরাশানের) কাছ থেকে”। এই কর্তৃত্বকারী কোম্পানীর সংখ্যা খুব বেশী নয়। মাত্র ১০টি বহুজাতিক কোম্পানি বিশ্বের ৭৩% জিএম বীজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই দশটির মধ্যে মাত্র ৩টি কোম্পানি মনসান্তো, সিনজেন্তা ও ডু-পন্ট ৫৩% বাজার দখল করে আছে। তবে এই তিন মোড়লের মধ্যে মনসান্তো একাই ২৩% বাজার দখলে রেখেছে। [Who Owns Nature, Corporate Power and the Final Frontier in the commodification of life, ETC group, 2008] এরাই আবার কীটনাশকের বাজারে ৯৫% দখল করে আছে। অর্থাৎ বীজের বাজার ও কীটনাশকের বাজার একই কোম্পানির হাতে রয়েছে।
প্রচুর সুর্যালোক, উত্তরে হিমালয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বৃষ্টিপাত এবং বিশাল তিন নদীর মোহানায় জেগে ওঠা বদ্বীপ বাংলাদেশের জমি অতি উর্বর। এই দেশ কৃষি ফসলের দেশ, যাকে বলে সুজলা সুফলা শস্য শ্যমলা বাংলাদেশ। অথচ এই কৃষিকে ক্রমাগতভাবে কৃষকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে সোপর্দ করা হচ্ছে। এই দেশে কোন প্রয়োজন ছাড়াই জিএম ফসলের প্রবর্তন করছে। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের ও পরিবেশের ক্ষতি করছে এবং কৃষক হাত থেকে কৃষি বীজ কেড়ে নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল করিয়ে দিচ্ছে।
এখনো বিশ্বের ৭০% খাদ্য সাধারণ কৃষকরাই মাত্র ২৫% চাষাবাদী জমিতে উৎপাদন করছে। কৃষকের নিজস্ব জ্ঞানের ব্যাবহার করে বৈচিত্র্যপুর্ণ, পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু খাদ্য তারা উৎপাদন করছেন এবং শুধু মানুষ নয় অন্য সকল প্রাণীর খাদ্যের যোগান দিচ্ছেন। তারাই এখনো বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ মানুষের জীবন-জীবিকার সংস্থান করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঝুঁকিপুর্ণ সময়ে বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে রাসায়নিক সার-কীটনাশক ছাড়া উৎপাদন গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে এটাই সমাধান হিসেবে আসবে।
লেখক : ফয়সল অভি, আইনজীবী, faysal.ovi@gmail.com প্রকাশ : দখিনা মাসিক ম্যাগাজিক, ৪৩তম সংখ্যা
Tariqul Islam's Fun Page Keep life happy with worship