শ্রমের মর্যাদা রচনা পাঠ করবার আগে- শ্রম ও মানুষ সম্পর্কিত বয়ান

সমস্ত সম্পদের উৎস হলো শ্রম । প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া উপাদানকে শ্রম রূপান্তরিত করে সম্পদে, সে প্রকৃতির পরেই শ্রমের স্থান । সমস্ত মানবিক জীবনের প্রাথমিক মূলগত শর্ত হলো শ্রম এবং মানুষই হলো শ্রমের সৃষ্টি ।

লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে তৃতীয়ভূ-স্তর যুগে (টার্শ্যারি পিরিয়ড) গ্রীষ্ম মণ্ডলের কোথাও- হয়তো বা বর্তমানে ভারতমহাসাগরের গর্ভে নিমজ্জিত এক বিশাল মহাদেশ- বিশেষভাবে উন্নত কিছুটা মনুষ্যাকৃতির এক বানর জাতির বাস ছিল । তাদের সারা দেহ ছিল লোমে আবৃত, আর ছিল দাড়ি ও ছুঁচোলো কান। তারা বাস করত গাছে গাছে দল বেঁধে ।

তাদের যে জীবন ধারায় গাছে ওঠানামার ব্যাপারে হাতের কাজ ছিল পা থেকে ভিন্ন, তারই প্রত্যক্ষ পরিণাম হিসাবে ভূমির উপর দিয়ে হাঁটাচলার সময় তারা হাতের সাহায্য নেবার অভ্যাস থেকে ক্রমে ক্রমে নিজেদের মুক্ত করতে এবং সোজা হয়ে দাঁড়াবার ভঙ্গি আয়ত্ত করতে শুরু করল ।

মানুষের হাতে পাথর থেকে প্রথম ছুরিখানা তৈরি হবার আগে হয়তো এমন এক দীর্ঘ যুগ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, যার তুলনায় আমাদের পরিচিত ঐতিহাসিক যুগকে মনে হবে একান্তই নগণ্য । কিন্তু তারই মধ্যে চূড়ান্ত পদক্ষেপটা নেওয়া হয়ে গিয়েছিল : হাত হলো মুক্ত, তখন থেকে তা অর্জন করে যেতে পারল ক্রমেই বেশি বেশি নৈপুন্য ও কৌশল এবং এইভাবে অর্জিত উন্নততর নমনীয়তা সঞ্চারিত হলো বংশ-পরস্পরায়, বৃদ্ধি পেল পুরুষানুক্রমে । তাই হাত শুধু শ্রমের অঙ্গ নয়, শ্রমের সৃষ্টিও । কেবলমাত্র শ্রম, নিত্যনতুন কর্ম প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে অভিযোজন, এইভাবে অর্জিত পেশি রগ এবং দীর্ঘতর কালক্রমে অস্থিরও বিশেষ বিকাশের উত্তারাধিকার এবং জটিলথেকে জটিলতর নতুন নতুন কর্মপ্রক্রিয়ার উত্তরাধিকারসূত্র প্রাপ্ত এই নৈপুণ্য প্রয়োগের ফলেই মানুষের হাত হয়েছে এই উচ্চমাত্রায় নিঁখুত যে, সে যেন মায়াজাল সৃষ্টি করতে পেরেছে রাফায়েলের চিত্রকলা, তুরভালদসনের ভাস্কর্য আর পাগানিনির সঙ্গীত ।

হাতের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, শ্রমের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির উপরে যে প্রভুত্ব শুরু হলো, তা প্রতিটি অগ্রগতিকেই মানুষের দিগন্তরেখা প্রসারিত করে দিল । প্রাকৃতিক বস্তপুঞ্জে নতুন নতুন অজ্ঞাতপূর্ব গুণাগুণ মানুষক্রমাগত আবিষ্কার করে চলল । অপরপক্ষে পারস্পরিক সহায়তা ও যৌথ কর্মোদ্যমের দৃষ্টান্ত ক্রমাগত বাড়িয়ে এবং প্রত্যেকের কাছে এই যৌথ কর্মোদ্যমের সুবিধা তুলে ধরে শ্রমের বিকাশ অনিবার্যভাবেই সমাজের সদস্যদের নিবিড়তর বন্ধনে আবদ্ধ করতে সাহায্য করল । গড়ে উঠবার পথে মানুষ এমন একটি পর্যায়ে এল, যখন পরস্পরকে কিছু বলবার প্রয়োজন তাদের হলো । এই ঘোষণা তার নিজস্ব অঙ্গ সৃষ্টি করল; স্বরের দোলন দ্বারা ক্রমাগত উন্নততর স্বরগ্রাম সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অপরিণত কণ্ঠনালী ধীর অথচ স্থির গতিতে মানুষের রূপান্তর হয়েছিল । ক্রমে ক্রমে মুখের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি একটার পর একটা স্পষ্টধ্বনি উচ্চারণ করতে শিখল । অর্থাৎ শ্রম থেকে এবং শ্রমের সঙ্গেই ভাষার উৎপত্তি ।

পাখির মুখযন্ত্র স্বভাবতই মানুষের মুখযন্ত্র থেকে একেবারে সতন্ত্র, তবুও প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র পাখিই পারে কথা বলা শিখতে, আর পাখিদের মধ্যে যার স্বর সবচাইতে বিকট সেই শুকপাখিই কথা বলে  সবচাইতে ভালো । যে কথা সে বলে তার অর্থ সে বোঝেনা- এটা সত্য নয় । এ কথা সত্য যে নিছক কথা বলা আর মানুষের সাহচর্যের আনন্দে শুকপাখি ঘন্টার পর ঘন্টা অবিরতভাবে তার মুখস্থ করা বুলি বারংবার বকে চলে । কিন্তু নিজের ধারণার পরিধির মধ্যে যে-সব কথা বলে তা বুঝবার শিক্ষাও সে আয়ত্ত করতে পারে । একটা শুকপাখিকে এমন করে গালাগালির ভাষা আওড়াতে আপনি শেখান, যাতে সে তার অর্থ সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারে ।  তারপর পাখিটাকে উ্ত্যক্তকরে তুলুন- শীগগিরই দেখতে পাবেন যে বার্লিনের ফলওয়ালাদের মতো সেও জানে, কেমন করে নির্ভুলভাবে তার গালাগালির ভাষাগুলি ব্যবহার করতে হয় ।

শ্রমের শুরু হলো হাতিয়ার তৈরি থেকে । কিন্তু প্রাচীনতম হাতিয়ার বলতে কি পাই- প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বংশানুক্রমিকভাবে প্রাপ্ত যে সামগ্রীগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে, তথা আদিমতম প্রাগৈতিহাসিক জাতিগুলির এবং সমসাময়িককালের অসভ্যতম বন্যদের জীবনযাত্রার ধরনের দিক থেকে বিচার করলে যা সবচেয়ে প্রাচীন । প্রাচীনতম হাতিয়ার ছিল শিকার করবার এবং মাছ ধরবার হাতিয়ার- প্রথমটিকে অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হতো । আমিষ আহার্যের ফলে পরিপাকের সময় হলো সংক্ষিপ্ত । শুধু তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিদ-জীবনের অনুরূপ অন্যান্য উদ্ভিদসুলভ দৈহিক ক্রিয়ারও সময় সংক্ষেপিত হলো আর এইভাবে যথার্থ অর্থে প্রাণীজীবনের সক্রিয় অভিব্যক্তির জন্য লাভ হলো আরও সময়, উপাদান ও আকাঙ্ক্ষা । আর নির্মীয়মাণ মানুষ উদ্ভিজ্জ জগৎ থেকে যতটাসরে যায় কিন্তু জীবন থেকেও ততটাই সে উন্নীত হতে থাকে । আমিষের সঙ্গে সঙ্গে নিরামিষ আহারে অভ্যস্ত হবার ফলে যেমন বন্য বিড়াল ও কুকুর মানুষের পরিচারকে পরিণত হয়েছিল, নিরামিষের সঙ্গে সঙ্গে আমিষ আহার গ্রহণের অভ্যাস তেমনি নির্মীয়মাণ মানুষের দৈহিকশক্তি ও স্বাধীনতা লাভে প্রচুর সাহায্য হলো । আমিষ আহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলফলেছিল কিন্তু মতিষ্কের উপরে, পুষ্টি ও বিকাশ লাভের উপযোগী উপাদানসমূহ তা লাভ করতেলাগল আগের চেয়ে অনেক বেশি । আমিষ আহার ছাড়া মানুষের বিকাশ সম্ভব হয়নি । তাই যত জাতির কথা জানি তাদের সকলের মধ্যে এই আমিষ আহার যদি কোনা না কোনো সময়ে তাদের মধ্যে নরখাদক বৃত্তির সৃষ্টি করে থাকে, তা নিয়ে খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই । বার্লিনবাসীর পূর্বপুরুষ ওয়েলটেরিয়ান বা উইলজিয়ানরা দশম শতাব্দী পর্যন্ত তাদের পিতা-মাতার  মাংস খেত ।

আমিষ আহার দুটি ক্ষেত্রে এমন নতুন অগ্রগতি ঘটিয়েছিল, যার গুরুত্ব চূড়ান্ত; আগুনকে কাজে লাগানো আর জন্তু জানোয়ারকে পোষ মানানো। প্রথমটি পরিপাক প্রক্রিয়াকে আরো সংক্ষেপিত করে কারণ মুখ, বলা যেতে পারে, আধাআধি পরিপক্ক খাদ্য পেয়ে গেল । দ্বিতীয়টি শিকার ছাড়াও মাংস পাবার জন্য নতুন ও অধিকতর নিয়মিত এক উৎস খুলে দিয়ে মাংসের সরবরাহ আরো বাড়িয়ে দিল । শুধু তাই নয়, এরফলে মানুষদুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যাদিও পেল, উপাদানের দিক থেকে অন্তত মাংসের সমানই এই নতুনখাদ্যের মূল্য । তাই এই দুটি অগ্রগতিই প্রত্যক্ষভাবে মানুষের মুক্তির নতুন উপায় হিসেবে কাজ করল ।

মানুষ যেমন ভক্ষণযোগ্য যে-কোন আহার্য গ্রহণ করতে শিখল, তেমনি সে শিখল যে-কোনও জলবায়ুতেই বাস করতে । পৃথিবীতে বাসোপযোগী সমস্তঅঞ্চলের উপর ছড়িয়ে পড়ল মানুষ, সেই একমাত্র প্রাণী যে শুধু নিজেরই চেষ্টাই এ কাজ করবার ক্ষমতা রেখেছিল । অন্য যত প্রাণী- যেমন গৃহপালিত পশু, পরগাছা, কীপতঙ্গ- যারা সমস্ত রকমের জলবায়ুতেই জীবনধারণে অভ্যস্ত হয়েছে তারা নিজেদের বলে এ রকম হয়নি, তারা এগিয়েছে মানুষের পিছু পিছু । মানুষের আদি বাসভূমির একটানা উষ্ণ জলবায়ু থেকে উৎক্রান্তি ঘটল । শীতলতর অঞ্চলগুলিতে যেখানে শীতে গ্রীষ্মের বছর বিভক্ত, ফলে দেখাদিল নতুন প্রয়োজন; ঠাণ্ডা আর আর্দ্র বায়ুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য আশ্রয় আর পোশাক, সুতরাং শ্রমের নতুন নতুন শাখা আর সঙ্গে নতুন কর্মকাণ্ডেও, তা মানুষকে ক্রমশ পশু থেকে আরও পৃথক করে দিল ।

প্রাণীরা শুধু বহিঃপ্রকৃতিতে ব্যবহার করে এবং কেবলমাত্র নিজেরে উপস্থিতি দ্বারা প্রকৃতির মধ্যে পরিবর্তন আনে; মানুষ কিন্তু তার পরিবর্তন দ্বারা প্রকৃতিকে তার উদ্দেশ্য সাধনে লাগায়, প্রকৃতির উপর প্রভূত্ব করে । এই হলো মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর চূড়ান্ত ও মূলগত পার্থক্য । আর শ্রমই ঘটিয়েছে এই পার্থক্য । প্রকৃতির উপরে মানুষের এই জয়লাভ মানুষের জন্য খুব সুখকর নয়। কারণ ঐ রকম প্রতিটি জয়লাভের জন্যই প্রকৃতি মানুষের উপর প্রতিহিংসা গ্রহণ করে । মেসোপটেমিয়া, গ্রীস, এশিয়া মাইনর এবং অন্যান্য জায়গায় যে মানুষ কৃষি উপযোগী জমিপাবার জন্য অরণ্যকে নির্মূল করে দিয়েছিল, তারা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারেনি যে অরণ্যের সঙ্গে সঙ্গে এইভাবে জলীয় বাষ্প সংগ্রহ ও ধারণ করবার কেন্দ্রগুলিও নিঃশেষিতকরে তারা এই দেশগুলির বিধ্বস্ত অবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে যাচ্ছিল । উভয়ের ঢালুজমিতে যে পাইন অরণ্যগুলিকেই এত যত্নে রক্ষা করা হয়েছে আলপসের ইতালীয়রা যখন দক্ষিণঢালুতে সেই পাইন অরণ্যগুলিকেই নিঃশেষ করে ফেলল, তখন তাদের একটু ধারণা ছিল না যে, তারা এইভাবে পার্বত্য পশুপালনের মূলেই কুঠারঘাত করছে । এতে করে যে তারা বছরেরবেশির ভাগ সময়ের জন্য তাদের পার্বত্য ঝোরাগুলির জল অপহরণ করছে ও বর্ষাকালের সময়সমতলভূমিতে তাদের আরো উন্মুক্ত জলস্রোত সম্ভব করে তুলেছে এধারণা তাদের ছিল আরো কম। ইউরোপে যারা আলু ছড়িয়েছিল তাদের মনেও আসেনি যে শ্বেতসার জাতীয় এই আলুর সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রহ্নিস্ফীতি(scrofula) রোগের জীবাণুও ছড়িয়ে দিচ্ছে । প্রতিটি পদক্ষেপে এইভাবে মানুষের স্মরণ রাখতে হয় যে, বিজেতা যেমন বিজিত জাতির উপর আধিপত্য বিস্তার করে, মানুষ কোন অর্থেই সেভাবে প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব করে না । বরং রক্ত, মাংস আর মতিষ্ক নিয়ে মানুষ প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত, প্রকৃতির মধ্যে মানুষের অস্তিত্ব; এবং প্রকৃতির উপর মানুষের সমস্ত প্রভুত্ব এইখানে যে অন্য সকল জীবের চেয়ে মানুষের এই সুবিধা যে, মানুষ প্রকৃতির নিয়ম আয়ত্ত করতে এবং নির্ভূল প্রয়োগ করতে সক্ষম ।

আরবেরা যখন সুরাসুর(অ্যালকোহল) পরিস্রুত করতে শিখল, তখন বুঝতেও পারেনি যে, এই করে তারা তখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের বিলোপসাধনের প্রধান একটি অস্ত্র তৈরি করেছিল । তারপর কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করলেন তিনি জানতেন না যে, তাতে করে যে দাসপ্রথা ইউরোপে অনেক কাল আগেই রহিত হয়েছে তাকে তিনি নবজীবন দান করছেন ও নিগ্রো ব্যবসার ভিত্তি স্থাপন করছেন ।

তাই মানুষ কি ভেবেছে, যে শ্রমের সস্পূর্ণ কার্যক্রমকে কর্ম বলে বিবেচিত হয়েছে, সে কর্মফলের প্রতিক্রিয়া থেকে সে মুক্ত নয় ।

[ ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এর রচনা অবলম্বনে ]

About B@ngl@desh1

Check Also

ফ্রিলান্সিং- মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুনদের স্বপ্নভঙ্গের নতুন ভাইরাস।

ফ্রিলান্সিং- মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুনদের স্বপ্নভঙ্গের নতুন ভাইরাস। দায়ী কে? . পুরো লেখাটি না পড়ে, আপনি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *