আগে বাড়ির একটা অলিখিত নিয়ম ছিল।

আগে বাড়ির একটা অলিখিত নিয়ম ছিল, কর্তা, গিন্নী আর বাচ্চারা ছাড়া কেউ বাড়ির শোবার ঘরে ঢুকবে না।
এর পর ধীরে ধীরে নিয়ম শিথিল হল, ঘনিষ্ঠরা জরুরী প্রয়োজনে ঐ ঘরে প্রবেশের সুযোগ পেল। কালের পরিক্রমায় নিয়মগুলো বিলুপ্ত হয়ে পরিচিতরা সেখানে বসে আড্ডা দেয়াটাই কালচার হয়ে গেল।
এসব ভালই ছিল, আন্তরিকতার একটা নব ধারা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু “কাঁপল ব্লগ, ফ্যামেলি ব্লগ” নামের ভিডিও ব্লগ হয়ে, এখন ব্যক্তিগত শব্দটাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

প্রথম প্রথম নিজেদের ব্যক্তি জীবন দেখিয়ে ফলোয়ার আকৃষ্ট করা হয়। তারপর ফলোয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে, কনটেন্ট ক্রিয়েটের নামে সারাক্ষণ ওনাদের “সুখের বিজ্ঞাপন” দিতে হয় । পি আর প্রেশারে ফলোয়ারদের ধরে রাখতে, নানা রঙের , ঢঙের সুখ উপস্থাপন করে যেতে হয়।

এক সময় দর্শকরা এই সব সুখ দেখে দেখে যখন বোর হয়ে যায়, তখন তাদের সামনে দুঃখের বিজ্ঞাপন করতে হয়। সেই দুঃখও আবার কঠিন কোন দুঃখ না। “ও আমার উপরে রাগ করে আছে” টাইপ রোম্যান্টিক দুঃখ !
ভেবে দেখেন,
আপনি কোথাও ঘুরতে গেছেন, আপনি ঐ যায়গার ভিউ দেখে আনন্দে উচ্ছ্বাসিত হচ্ছেন না, আপনি উচ্ছ্বাসিত হচ্ছেন ক্যামেরার চোখ দিয়ে আপনাকে যারা দেখবে, তদের দেখানোর জন্য !

এই মানুষগুলো এলিয়েন না, এরা আমাদের মত সাধারণ মানুষ অথচ তাদের ব্লগ দেখলে মনে হবে, তাদের কোন দুঃখ নাই, হতাশা নাই, বিফলতা নাই, অন্যায় নাই, ভুল নাই!
শুধু কি টাকার জন্য এই কাজটা করেন ?

না। এখানে অদ্ভুত একটা মনস্তত্ত্ব আছে ।
মিথ্যা, বানোয়াট জীবনে অভ্যস্ত এসব মানুষেরা এক ধরণের ডিলিউশনে ভোগেন, নিজেদের সুপার হিউম্যান ভাবেন। ওনারা মনে করেন , লক্ষ লক্ষ মানুষ ওনাদের ব্যক্তিগত জীবন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই ওনারা ওনাদের এই অভিনীত জীবন না দেখালে, অসংখ্য মানুষ খুব ই দুঃখ পাবে ! সুতরাং ফলোয়ারদের জন্য-ই কনটেন্ট ক্রিয়েট করেন আর ওনাদের নিয়মিত ভিডিও পোষ্ট করতেই হবে।

মিথ্যা জীবনের বোঝা টেনে নেয়া সহজ না । তাই একসময় বোঝা বইতে না পেরে, কেউ কেউ নিজেদের আসল সত্যিটা প্রকাশ করে ফেলেন। তখন জানা যায়, এরা আসলে যা দেখিয়েছে তা সত্যি না ।
সমস্যা হল, ব্যক্তি জীবন পাবলিক করায়, ওনারা নিজেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, সেই সাথে এইসব বানোয়াট জীবন বিশ্বাস করা মানুষেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।

মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা , বিশ্বাস, সম্মানবোধ, ভরসা নামক সুন্দর সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় জটিলতা, মানসিক সমস্যা, ক্রাইম এবং খুব ই অস্বাস্থ্যকর জীবনবোধ।

মানুষগুলো ভুলে যাচ্ছে সব কিছু পাবলিক করতে নেই। সম্পর্কের গোপন বিষয়গুলো যতক্ষণ ব্যক্তিগত থাকে ততক্ষণ সুন্দর থাকে, যখন পাবলিক হয়ে যায় তখন তা বিনোদনের সস্তা উৎসে পরিণত হয়।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক সুন্দর রাখার প্রধান সূত্র হল , “ব্যক্তিগত কে, পাবলিক করতে নেই আর পাবলিক কে কখনো ব্যক্তিগত জগতে প্রবেশ করাতে নেই”
.
লেখা-Foring camelia (প্রথম প্রকাশ- ডিসেম্বর -২১/২০২৩)

About Rajib Paul

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *